বিয়ের দুই মাস পর জানতে পারলাম, আমার শ্বশুরই আমার মায়ের প্রথম স্বা’/মী… more

বিয়ের দুই মাস পর জানতে পারলাম, আমার শ্বশুরই আমার মায়ের প্রথম স্বামী!

আমার নাম মেহের। ভালোবেসে আবিরকে বিয়ে করেছিলাম। ভেবেছিলাম, ভালোবাসার মানুষটিকে পাশে পেলে জীবনের সব প্রতিকূলতা সহজেই পার করে দিতে পারব। কিন্তু বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় এমন এক সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, যা আমার সাজানো পৃথিবীটাকে মুহূর্তেই তছনছ করে দেবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।

বিয়ের দুই মাস পর জানতে পারি, আমার শ্বশুরের সঙ্গে আমার মায়ের অতীতে বিয়ের সম্পর্ক ছিল। কথাটা প্রথম শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। অথচ সেই সত্যের ভয়াবহতা তখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আজ সেই পুরোনো সম্পর্কের কথা নিজের কানে শোনার পর মনে হচ্ছে, আমার জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক যেন নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে গেছে।

সম্প্রতি আবিরের চাকরি চলে গেছে। আর সেই সুযোগে শ্বশুরবাড়ির মানুষজন আমাদের সংসার থেকে আলাদা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ছোট দেবরও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, সে আমাদের সংসারের জন্য এক টাকাও খরচ করবে না। উল্টো শ্বশুরমশাইয়ের সিদ্ধান্ত, মাস শেষে ছেলেদেরই তাঁকে খরচের টাকা দিতে হবে।

প্রেম করে বিয়ে করেছি বলে নিজের পরিবারের কাছেও কিছু বলতে সংকোচ হয়। মায়ের সঙ্গে অভিমান করে প্রায় দুই মাস কথা বলিনি। কিন্তু আমার এই দুরবস্থার খবর কোনোভাবে মায়ের কানে পৌঁছে যায়। দুই মাসের অভিমান ভুলে মা আজ প্রথমবারের মতো আমাকে দেখতে এসেছেন।

আমি জানতাম না মা এসেছেন।

হঠাৎ নিচতলা থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে কারও তর্ক হচ্ছে। কৌতূহলবশত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। ঠিক তখনই মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।

মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলছেন,

— নিজের ছেলের বউকে এভাবে বাড়ি থেকে আলাদা করে দিতে আপনাদের একটুও বিবেকে বাধছে না? ছেলেটার চাকরি চলে গেছে, তাই বলে কি তার স্ত্রীকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে হবে?

এরপর শ্বশুরমশাইয়ের কণ্ঠ শুনলাম। আর তাঁর পরের কথাগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এল।

তাঁরা একে অপরকে নাম ধরে সম্বোধন করছেন। কথার মধ্যে উঠে এল বহু বছর আগের সম্পর্কের প্রসঙ্গ। একপর্যায়ে শ্বশুরমশাই এমন কিছু বললেন, যা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।

আমার মা একসময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন!

সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, মাথার ভেতরে কেউ যেন প্রচণ্ড আঘাত করেছে। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এত দিন যাঁকে নিজের শ্বশুর বলে জেনেছি, তিনি আমার মায়ের প্রথম স্বামী!

তাহলে আবিরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের পেছনে এমন কোনো সত্য লুকিয়ে আছে, যা আমি জানি না?

আবির কি সব জানে?

নাকি সেও আমার মতো অন্ধকারে রয়েছে?

একটার পর একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। ঠিক করলাম, আগে আবির বাড়ি ফিরুক। তারপর সব খুলে বলব।

এমনিতেই সারাদিন শাশুড়ির খোঁটা শুনতে শুনতে হাঁপিয়ে উঠেছি। তার ওপর এই নতুন সত্য আমাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।

হঠাৎ পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলাম।

— কিরে মেহের, এভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিস কেন? কিছু হয়েছে?

তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলাম। মা যেন আমার মুখ দেখে কিছু বুঝতে না পারেন।

— না মা, কিছু হয়নি।

— তাহলে চল, আমার সঙ্গে।

— কোথায়?

মা এবার বিরক্ত হয়ে আমার হাতের কবজি ধরে বললেন,

— সব জেনেও না জানার ভান করবি না। তোর জামাইয়ের চাকরি নেই, আর এদিকে তোর শ্বশুর তোদের আলাদা করে দিচ্ছে। খাবি কী, থাকবি কোথায়? চল আমার সঙ্গে। তুই তো এমন পরিবেশে অভ্যস্ত না।

মায়ের চোখেমুখে অদ্ভুত এক জেদ। এমন রূপে তাঁকে আগে কখনো দেখিনি।

আমি শান্তভাবে বললাম,

— প্লিজ মা, তুমি যাও। চাকরি চলে গেছে তো কী হয়েছে? আবার একটা চাকরি হয়ে যাবে। আর আলাদা করে দিলে সেটা আবির দেখবে। এই বাড়িতে ওরও অধিকার আছে। আমার এখানে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি ভালো আছি।

মা যেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারলেন না।

— ভালো আছিস? এই পরিস্থিতিতেও তুই বলছিস ভালো আছিস?

আমি আর কিছু বললাম না। মা রাগ করে চলে গেলেন। আমিও তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করলাম না। যে বাড়িতে নিজেরাই শান্তিতে খেতে পারি না, সেখানে মাকে কীভাবে থাকতে বলব?

মা চলে যাওয়ার পর আবার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলাম। কখন আবির ফিরবে, সেই অপেক্ষায় সময় কাটছিল না। টেনশনে মনে হচ্ছিল, মাথাটা ফেটে যাবে।

বিয়ের সময় কেউ আমাদের বলেনি, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। প্রেম করে বিয়ে করেছি বলে পরিবারের কাছে নিজের কষ্টের কথাগুলোও ঠিকমতো বলতে পারি না। অথচ প্রতিদিন এই বাড়িতে অপমান আর খোঁটা সহ্য করে দিন কাটাতে হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমা বসে আছেন। কী বলব বুঝতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।

এমন সময় ছোট দেবর বাড়িতে ঢুকল। আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তার পেছনেই আবিরকে দেখতে পেলাম।

ঘামে ভেজা শার্ট শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মুখজুড়ে ক্লান্তি, চোখেমুখে দিনের পর দিন ব্যর্থতার ছাপ। ওকে দেখেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

আবির কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য শান্তি পেলাম। কিন্তু মনের ভেতরের প্রশ্নগুলো আরও জোরে মাথা তুলল।

যদি আমার মা একসময় আমার শ্বশুরের স্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে আবিরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের মধ্যে কোনো জটিলতা আছে কি না, সেটা জানা জরুরি।

আমার মনে হচ্ছিল, আবির হয়তো সব জানে। হয়তো এত দিন আমার কাছ থেকে সত্যটা লুকিয়ে রেখেছে।

কিন্তু ওকে দেখেই কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না।

আবির আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? মুখটা এমন গোমড়া করে রেখেছ কেন? কিছু হয়েছে?

বলতে বলতে আমাকে জড়িয়ে ধরেই ঘরে নিয়ে গেল।

ঘরে ঢুকে প্রতিদিনের মতো ওকে এক গ্লাস পানি দিলাম। আবির চুপচাপ পানি খেয়ে নিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করতে গিয়েও থেমে গেলাম।

ও কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে?

যদি সত্যিই সব জানে, তাহলে এত দিন আমাকে কিছু বলেনি কেন?

ভাবলাম, একটু বিশ্রাম নিক। তারপর কথা বলব।

আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,

— চাকরির কী হলো?

আমার প্রশ্ন শুনে আবির আমার দিকে তাকাল। ওর চোখেই বুঝতে পারলাম, আজও কোনো সুখবর নেই।

আমাকে পাশে বসিয়ে হাত ধরে বলল,

— সরি মেহের। আজও চাকরিটা হলো না। আমাকে ক্ষমা করো। তোমাকে সুখে রাখার কথা ছিল, অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না।

ওর কথায় বুকটা ভারী হয়ে এল।

— এসব বলছ কেন? আজ হয়নি তো কাল হবে। তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসছি।

আবির ওয়াশরুমে চলে গেল। আর আমি খাবার আনতে রান্নাঘরে গেলাম।

সেখানে গিয়ে দেখি, শাশুড়িমা খাবার পরিবেশন করছেন। আমাকে দেখেই মুখ শক্ত করে বললেন,

— আজকে যেমন-তেমন খেয়ে নাও। কাল থেকে নিজের স্বামীর টাকায় জিনিসপত্র কিনে রান্না করে খাবে। আমার কোনো জিনিসে হাত দেবে না। রান্নাঘর শুধু রান্না করার জন্য ব্যবহার করবে, বুঝেছ?

আমি মাথা নিচু করে বললাম,

— ঠিক আছে মা।

উনি নিজেদের খাবার নিয়ে চলে গেলেন।

মুখে যতই বলি ঠিক আছে, বুকের ভেতরটা ততই হাহাকার করে উঠল। আবিরের চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো কথা শুনতে হচ্ছে। খেতে গেলে খোঁটা, বসতে গেলে খোঁটা, একটু ভুল হলেই অপমান।

কত দিন এভাবে চলবে, জানি না।

চোখের পানি গিলে আবিরের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে ফিরলাম। ওর সামনে খাবার রেখে চুপচাপ বসে রইলাম।

মনের মধ্যে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন।

আমার মা যদি সত্যিই আমার শ্বশুরের প্রথম স্ত্রী হয়ে থাকেন, তাহলে আবিরের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে কী?

আবির কি এই সত্য জানে?

নাকি এমন কোনো ভয়ংকর রহস্যের মধ্যে আমরা দুজনেই জড়িয়ে পড়েছি, যার পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারিনি?

সেদিন রাতে আমি শুধু আবিরের বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করিনি। অপেক্ষা করছিলাম আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।

কারণ, কিছু সত্য জানার পর মানুষ শুধু অন্যদের নয়, নিজের অস্তিত্বকেও নতুন করে প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়।

আর আমি জানতাম, আবিরকে প্রশ্নটা করার পর আমাদের জীবন হয়তো আর আগের মতো থাকবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আপু তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সম্পূর্ণ মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। তাকে কি পরামর্শ দিবো বুঝতে পারছি না তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

Author: Desh Katha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *