কুড়িগ্রামে দুই বোনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের দাবি, নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বিগ্ন পরিবার
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দুই বোনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খবর ঘিরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় দুই বোন নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন বলে জানান। বিষয়টি নিয়ে সে সময় পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।
কলেজে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন দুই বোন
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বোনের নাম স্নিগ্ধা রানী (২৪) ও পূর্ণিমা রানী (১৮)। তাঁরা কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং তাঁদের বাবা শৈলেন্দ্র নাথ বর্মণ পেশায় একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দুই বোন একসঙ্গে কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু তাঁরা বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের বাবা রাজারহাট থানায় নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডি করেন।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ধর্ম পরিবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে শুরুতে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কথা জানান দুই বোন
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বোনের ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁদের নতুন নাম হিসেবে মারইয়াম জান্নাত ও হুমায়রা জান্নাতের কথা উল্লেখ করা হয়।
লালমনিরহাটের আদালতে হলফনামা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন আইনজীবীও তাঁদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে সংবাদে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুই বোনের নিজেদের বক্তব্য। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তাঁরা জানান, নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং কারও চাপ বা জোরাজুরিতে এ সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার কথাও বলেন।
সন্তানদের খোঁজে উদ্বিগ্ন ছিলেন বাবা-মা
দুই বোনের ধর্ম গ্রহণের খবর প্রকাশ্যে এলেও তাঁদের অবস্থান নিয়ে পরিবারের উদ্বেগের কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তাঁদের বাবা জানিয়েছিলেন, মেয়েরা কোথায় আছেন এবং নিরাপদে আছেন কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন।
পরিবারের উদ্বেগের বিষয়টি ছিল তাঁদের অবস্থান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। অন্যদিকে, দুই বোনের প্রকাশিত বক্তব্যে তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা এবং নিরাপদে থাকার দাবি জানান।
এ ধরনের ঘটনায় পরিবারের উদ্বেগ এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত—দুই বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারও ধর্মীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে হয়রানি করা যেমন অনুচিত, তেমনি কারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে সেটিও যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
পুলিশ কী জানিয়েছিল?
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, পুলিশ দুই বোনের সন্ধানে অনুসন্ধান চালায়। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাগেশ্বরী এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে সেই অভিযানে দুই বোনকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে তাঁদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ তথ্য পেয়েছে বলে জানানো হয়। অর্থাৎ, ধর্ম পরিবর্তনের দাবি এবং তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সে সময় আলাদা আলাদা তথ্য সামনে এসেছিল।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ
এই ঘটনা আবারও ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের প্রিয়জনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে সেই উদ্বেগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুমাননির্ভর বক্তব্য, উসকানিমূলক মন্তব্য কিংবা যাচাই না করা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, পুলিশের তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
পুরোনো খবর নতুন করে ছড়ালে সতর্ক থাকুন
সবশেষে মনে রাখা দরকার, কুড়িগ্রামের দুই বোনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘটনাটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সংবাদ। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই অনুসন্ধানে ঘটনাটির নতুন কোনো নিশ্চিত অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করার আগে হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের সারকথা: কুড়িগ্রামের রাজারহাটে দুই বোনের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের দাবি, তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের উদ্বেগ এবং পুলিশের অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে বিষয়টি সে সময় আলোচনায় এসেছিল। তবে পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন তথ্য ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।