হাসিনাকে সেদিন ভারতে পৌঁছে দেন যারা, প্রকাশ্যে এলো নতুন তথ্য
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা। তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। সেদিন দুপুরের পর গণভবন থেকে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে প্রথমে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয় তাকে। এরপর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সামরিক পরিবহন বিমানে করে তিনি ভারত রওনা হন।
ঘটনার দুই বছর পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেদিনের সেই যাত্রা এবং তাকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা করার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই দ্রুত এবং সামরিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত।
গণভবন থেকে প্রথমে হেলিকপ্টারে
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবনের পেছনে অবস্থিত সাবেক বাণিজ্য মেলা মাঠে পৌঁছান। আনুমানিক দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে তারা বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টারে ওঠেন।
হেলিকপ্টারটি তাদের কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখানে কিছু সময় অপেক্ষার পর শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সি-১৩০ পরিবহন বিমানে তোলা হয়।
সামরিক বিমানে যারা ছিলে
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে বিমানে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। তার সামরিক সচিবও বিমানে ছিলেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলট ছিলেন উইং কমান্ডার মাহফুজ। তবে সেদিনের পুরো ফ্লাইট ক্রু ও নিরাপত্তা দলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারি ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
উদ্ধার অভিযানের সমন্বয়ে ছিলেন যে কর্মকর্তা
নতুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গণভবন থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে স্থানান্তর এবং এরপর সামরিক বিমানে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো উদ্ধার মিশনের সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, মিশনটি মূলত দুটি ধাপে পরিচালিত হয়—প্রথমে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে গণভবন এলাকা থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে স্থানান্তর এবং পরে সি-১৩০ পরিবহন বিমানে করে ভারত যাত্রা।
কখন বাংলাদেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা?
প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে সি-১৩০ পরিবহন বিমানটি বিকেলের দিকে উড্ডয়ন করে। পরে সেটি ভারতের গাজিয়াবাদের কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।
ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমসাময়িক প্রতিবেদনের সঙ্গে পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সময়ের সামান্য পার্থক্য দেখা গেলেও, শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সি-১৩০ পরিবহন বিমানে করে হিন্ডনে পৌঁছেছিলেন—এ বিষয়ে একাধিক সূত্রের প্রতিবেদন রয়েছে।
ভারতে পৌঁছানোর পর কী হয়েছিল?
ভারতের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনাকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গ্রহণ করেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল। এরপর তাকে একটি নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
ভারতীয় নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশ করার পর দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ফ্লাইটটির ওপর নজর রাখছিল। এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুটি রাফাল যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়।
ভারতীয় সংসদেও যাত্রাপথের তথ্য উঠে আসে
পরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সংসদে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়ে বক্তব্য দেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে করে বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে যাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানে করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন এবং আগরতলা হয়ে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন শেখ রেহানা।
কেন এত দ্রুত দেশ ছাড়তে হয়েছিল?
৫ আগস্ট সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিও দ্রুত সম্পন্ন করা হয় বলে পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দুপুরের পর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সেনানিবাসে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।